Saturday, May 29th, 2021

Astro Research Centre

ভগবান বিষ্ণুর অনেক নাম

ভগবান বিষ্ণুর অনেক নাম

ভগবান বিষ্ণু সর্বব্যাপী, বিভু-সমগ্র চরাচর বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে এমন একটি স্থান বা বস্তু দেখাতে পারবে না, যেখানে তাঁর সত্তা নেই। সূতরাং, এ কথা বলা বাহুল্য মাত্র যে, তাঁর শক্তি এবং মহিমাও অনন্ত, অপার; তাঁর নামের সংখ্যাও অনন্ত, অংকশাস্ত্র দিয়ে তা নির্ধারণ করা কঠিন। ভক্তসাধকেরা তাঁকে এক নামে অষ্টনামে, ষোড়শ নামে, অষ্টবিংশতি নামে, শতনামে, সহস্র নামে স্তুতি করেছেন, তথাপি তদীয় নামমহিমার অন্ত খুঁজে পাননি। তবে তারা একথা ভাল করেই জানেন যে, নামের মধ্যেই রয়েছেন সেই নামী। নামের ভজনা করলেই নামীকে পাওয়া যায়, নামের তত্ত্ববব জানলেই নামীয় তত্ত্ব উপলব্ধ হয়।


“যেই নাম সেই কৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি,
নামের সহিত আছেন আপনি শ্রীহরি”




ভগবান বিষ্ণুর চ্যুতি বা বিনাশ নাই, অথবা তিঁনি জন্ম, স্থিতি, বৃদ্ধি, পরিণাম, ক্ষয় ও নাশ এই ষড়বিধ ভাববিকাররহিত, তাই এই সনাতন পরম পুরুষের এক নাম অচ্যুত, সর্বব্যাপক এবং সর্বান্তযামী নিবন্ধন বিষ্ণু; জীবের সংসার বন্ধন হরণ করেন তাই হরি; “সৎসু সাধুঃ”; তাই সত্য। তিঁনি জননামক অসুরকে বিত্রাসিত করেছিলেন, অথবা জনগণ তাঁকেই যাচ্ঞা করে, তাই তিঁনি জনার্দন; যাবতীয় জাগতিক বন্ধনকে হনন বা বিনাশপূর্বক তিঁনি মায়াতীত, নিত্যযুক্ত পুরুষরূপে বিরাজমান, তিঁনি “সোহহং” তত্ত্বের মূর্তপ্রতীক, তাই বিষ্ণুনামাষ্টকে তাঁকে বলা হয়েছে “হংস”; প্রলয়কালে সমুদয় জগৎ একার্ণবীকৃত হলে তিঁনিই সকলের অয়ন বা আশ্রয়, তাই তিঁনি নারায়ণ। তিঁনিই “ক” অর্থাৎ ব্রহ্মা, “ঈশ” অর্থাৎ রুদ্র বা সংহর্তা, এতদতিরিক্ত বিশ^পালকও তিঁনি, তাই তার এক নাম “কেশব”। অথবা “কে” অর্থাৎ জলে শরবৎ শয়নহেতু তাঁর এই নাম।




বিষ্ণুর নাম “বাসুদেব” কেন? বিষ্ণু সমুদয় বস্তুতেই বাস করেন এবং সমুদয় বস্তুই বিষ্ণুতে বাস করে, এই বাস থেকেই হয়েছে “বাস”; তিঁনি দ্যোতনশীল বা প্রকাশস্বরূপ, অতএব, “দেব”। “বাসু” এবং “দেব” একত্র সংযুক্ত হয়েই বিষ্ণুর এক নাম হয়েছে বাসুদেব। চক্ষুঃ, কর্ণাদি হৃষীক বা ইন্দ্রিয়গণের ঈশ বা প্রভু, তিঁনি “হৃষীকেশ”; পুনশ্চ তিনিই অতীন্দ্রিয় অদ্বিতীয় সত্তা, তাই অধোক্ষজ।
ভগবান বিষ্ণুর এক নাম গরুড়ধ্বজ, কেন না তাঁর রথধ্বজা গরুড়চিহ্নিত। তিঁনি পু-রীকাক্ষ, কারণ, তাঁর আয়ত লোচনদ্বয় পদ্মপলাশের ন্যায় মনোহর, অথবা তিঁনি হৃদয়পু-রীকে অঙ্গুষ্ঠ পুরুষরূপে প্রকাশমান। তিঁনি যজ্ঞেশ; অর্থাৎ সর্বযজ্ঞস্বরূপ বা সকল যজ্ঞের অধীশ^র; বৈকুণ্ঠ, কারণ ভক্ত-জনের প্রতি করুণা বর্ষণে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা প্রকাশ করেন না; ধর্মগোপ্তা, কারণ, ধর্মের প্রতিপালন করেন; গোপাল, অর্থাৎ বিশ্বের পোষক ও রক্ষক।


বিষ্ণুর আয়ুধ চক্র, সার্ঙ্গধনু এবং কৌমোদকী গদা। এ সকল আয়ুধ শ্রীহস্তে থাকায় তিঁনি যথাক্রমে চক্রপাণি, সার্ঙ্গপাণি এবং গদাধররূপে পরিচিত। তাঁর এক নাম দামোদর। দাম অর্থে দড়ি। দাম উদরে যার তিঁনিই দামোদর। তাৎপর্য এই-আপাতবিশেষ সৃষ্টিবৈচিত্র্যের মধ্যে তিঁনিই ঐক্য, সমন্বয় ও মিলনের সূত্র, অথবা সূত্রে গাঁথা মণিগণের ন্যায় নিখিল ব্রহ্মা- তাতেই গ্রথিত। গীতায় শ্রীভগবান নিজ শ্রীমুখেই বলেছেন-“ময়ি সর্ব্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।” আপন সংযোগসূত্রে সকলকে তিঁনি নিজের সঙ্গে যুক্ত বা বন্ধ করে রেখেছেন। কিন্তু তিঁনি স্বয়ং সকল বন্ধনের অতীত। কৃষ্ণাবতারে মা যশোদা রজ্জু দ্বারা তাঁকে বন্ধনে প্রয়াসিনী হয়েছিলেন; কিন্তু তিঁনি বন্ধনরজ্জু হরণ করায় জননী ব্যর্থকাম হন। পরে জননীর সাধনশ্রমে প্রীত হয়ে স্বয়ং ধরা দেন। ভগবানকে কদাপি বাহ্য রজ্জু দ্বারা বন্ধন করা যায় না, চাই-প্রেমডোর, চাই-ভালবাসা।
আচার্য শঙ্কর তাঁর ভাষ্যদিতে মহাভারতোক্ত বিদুরের মত উল্লেখপূর্বক বলেছেন- “দমাৎ দামোদরং”, ব্যাসবচনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন-“দামানি লোকনামানি।” বিদুরের মতের অর্থ হলো দমাদি সাধনের দ্বারা লব্ধা উৎকৃষ্টা মতি যার, তিঁনিই দামোদর; ব্যাসবচনের অর্থ হলো সমুদয় লোক বা বিশ্বব্রহ্মা- যাঁর উদরে, অথবা লোকসমুদয় আত্মসাৎপূর্বক তদতিরিক্তরূপে যিঁনি বিদ্যমান, তিঁনিই দামোদর। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অনেক নামেরই এরূপ একাধিক অর্থ আছে।




ভগবান বিষ্ণুর এক নাম বৃষভ, কেন না, তিঁনি ভক্তের প্রতি নিত্য কামবর্ষী বা অভীষ্টবর্ষী; তিঁনি চির নয়নাভিরামূর্তি, তাই শ্রীমান; একমাত্র ‘গো’ বা বেদান্তবাক্য দ্বারাই তাঁর অপ্রাকৃত স্বরূপ অনুভবগম্য, তাই তিঁনি গোবিন্দ; ঐশ্বর্য, বীর্য, যশঃ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য এই ষড়ভগ পরিপূর্ণরূপে তাতে বিদ্যমান, তাই তিঁনি ভগবান্।
ভগবান্ বিষ্ণুর এক নাম ভেষজ; কেন না, তিঁনি ভবরোগহন্তা; প্রলয়কালে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মান্ডকে নিজ মধ্যে আকর্ষণ করেন, তাই সঙ্কর্ষণ; সংসারসক্ত বদ্ধ জীবকে “মুকু” বা মুক্তি দান করেন, তাই মুকুন্দ; পরিধানে পীতবাস, তাই পীতাম্বর; সকল দিকেই তার চক্ষুঃ, বাহু ও পদ, তাই যথাক্রমে সহস্রাক্ষঃ, সহস্রবাহু ও সহস্র পাৎ; ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান সকলই তিঁনি সম্যক্ পরিজ্ঞাত, তাই ত্রিকালজ্ঞ; তিঁনি ক্ষরের অতীত, অক্ষর হতেও উত্তম, তাই পুরুষোত্তম; সৎ বা অসৎ সকলেরই উৎপত্তির হেতু, তাই প্রভব; সমুদয় বিশ্বব্রহ্মা- ধারণ করেন, তাই ধাতা।



ভগবান্ বিষ্ণু একমাত্র শুদ্ধ জ্ঞানেই লভ্য, তাই তাঁর এক নাম জ্ঞানগম্য; তিঁনি মহাতেজস্বী, তাই ত্রিবিক্রম; তিঁনি স্বাধীন, তাই অনীশ; সর্বান্তর্যামী, তাই উদীর্ণ; স্বজাতীয়, বিজাতীয় ও স্বগতাদি ভেগরহিত, তাই এক ; পুনশ্চ এক হয়েও তিঁনি এক নন-আপনার দৈবী মায়াপ্রভাবে বহুরূপী, তাই নৈক। বিরাট, সুতাত্মা, প্রাকৃত ও তুরীয় ভেদে চারি প্রকার রূপহেতু বিষ্ণুর এক নাম ধর্মার্থকামমোক্ষাদি পুরুষার্থচতুষ্টয়ের উৎপত্তি তাঁর থেকেই, তাই তিঁনি চতুর্ভাব, ঋক্, সাম, যজুঃ, অথর্ব্বাদি চারি বেদের রহস্য তাঁর নখদর্পণে, তাই তিঁনি চতুর্ব্বেদবিদ্; চারিটি বাহুর বিদ্যমানতা হেতু চতুর্ব্বাহু; এইরূপ আরো কতিপয় চারি চারি তত্ত¦ বিষ্ণুচরিত্রে সংযোজিত। বিষ্ণুর বক্ষঃস্থল শ্রীযুক্ত রোমাবর্ত্তবিশিষ্ট, তাই তিঁনি শ্রীবৎস; তিঁনিই সকল সৌন্দর্য্য, ঐশ্বর্য্য, সৌভাগ্য, শীল-লক্ষ্মীর অধিপতি, তাই তার নাম শ্রীধর, শ্রীপতি, শ্রীনাথ ইত্যাদি। তিঁনিই সকল, তিঁনিই নিষ্কল। বরেণ্য, বরদ, মানদ, পুরাণ, কুটস্থ, অচল, যোগীশ-বিষ্ণুর এই সকল নামও সহস্র নামের তালিকায় স্থান লাভ করেছে। দেবগণের তেজোবৃদ্ধি কামনায় একবার শ্রীবিষ্ণু নাকি অযোধ্যয় গুপ্তভাবে তপস্যা করেছিলেন। এই গুপ্তবাসের জন্য যেখানে তার নাম হয়ে গেলে গুপ্তহরি। অযোধ্যয় প্রবেশকালে যেখানে তিঁনি সুদর্শন চক্রটিকে ত্যাগ করেছিলেন, সেই স্থানটি চক্রহরি নামে খ্যাত। পুরাণাদিতে বিষ্ণুর আরও কত নাম এবং আরো কত লীলাই বর্ণিত আছে, তা বলে শেষ করবে কে?

সংগৃহীত জয় শ্রী কৃষ্ণ



Blog Url:
https://arcsm.in/blog.php?blog=20210529173333